মজাদার ও লোভনীয় শুটকি মাছের ১০ পদের রেসিপি

আজ আমরা এমন একটা খাবার নিয়ে কথা বলবো যেটা আমাদের অনেক তীব্র অপছন্দ এবং অনেকের এতই পছন্দ যে নাম শুনলেই জিভে জল আসে। পাঠক বোধহয় আন্দাজ করে ফেলেছেন খানিকটা। হ্যাঁ , আমি শুটকির কথাই বলছি। শুটকির তীব্র গন্ধে কারো কারো নাড়িভুঁড়ি উপড়ে আসার উপক্রম হয়, কেউবা শুঁটকির কথা শুনলে শুটকির নানা পদের কথা বলতে থাকেন আর জিভ বেচারাকে লালার সাগরে ভাসিয়ে দেন। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এটা স্বীকৃত যে, শুঁটকি মাছে জীবিত মাছের চেয়ে বেশি পরিমাণ পুষ্টি থাকে। আজ আমরা শুঁটকির কয়েকটি রেসিপি নিয়ে কথা বলবো।

প্রথমেই জেনে নেই শুটকি কিভাবে তৈরি করা হয়। শুঁটকি মাছকে দুইটা ভিন্ন সংরক্ষণ প্রকিয়ায় তৈরি হয়, একটা রোদে শুকিয়ে অপরটি হল মাটির নিচে পুঁতে রেখে ব্যাকটেরিয়া ব্রিড করে। চ্যাপা শুঁটকি দ্বিতীয় ভাবে তৈরি হয়। তাই এটা পুরোপুরি শুঁটকি না হয়ে খানিকটা মাংসল থাকে যা বিকট দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে।

এক এক শুটকির এক এক স্বাদ। আজকে আপনাদের জন্য রয়েছে শুটকি মাছের ১২ পদের রেসিপি। দেখে নিন-

১। চ্যাপা শুটকি ভর্তা

উপকরণ :
১. চ্যাপা শুঁটকি ৫০ গ্রাম,
২. রসুন বাটা ২ টেবিল চামচ,

৩. রসুন স্লাইস আধা কাপ,
৪. পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ,

৫. মরিচ বাটা ২ টেবিল চামচ,
৬. হলুদ ভাটা ১ চা চামচ,

৭. ফিশসস ১ চা চামচ,
৮. লবণ স্বাদমতো,

৯. তেল ১/৩ কাপ,
১০. কাঁচা মরিচ ৪টি।

প্রণালি :শুঁটকি ভালো করে ধুয়ে বেটে নিন। কড়াইয়ে তেল দিয়ে গরম হলে পেঁয়াজ ও রসুন স্লাইস দিন। পেঁয়াজ ও রসুন নরম হলে হলুদ, মরিচ ও রসুন বাটা দিয়ে ভুনে নিন কোয়ার্টার কাপ পানি দিয়ে। মসলা ভুনাভুনা হলে শুঁটকি, লবণ ও ফিশসস দিয়ে ভুনতে থাকুন। স্বাদ অনুযায়ী লবণ দিন। বেশি ঝাল খেতে চাইলে কাঁচা মরিচ চিরে দিন। ঝাল কম খেতে চাইলে আস্ত মরিচ দিন। তেল চকচকে হয়ে কড়াই থেকে আলগা হলে নামিয়ে নিন।

২।দোমাছা

উপকরণ :
১. ছুরি মাছের শুঁটকি ১ কাপ,
২. কোরাল চিংড়ি মাছ ১ কাপ,

৩. পেঁয়াজকুচি ১ টেবিল চামচ,
৪. রসুনবাটা ১ চা-চামচ,

৫. গোটা রসুন কোয়া ৭-৮টি,
৬. পেঁয়াজবাটা ১ চা-চামচ,

৭. টমেটোকুচি ১ টেবিল চামচ,
৮. তেল ২ টেবিল চামচ,

৯. হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ,
১০. মরিচগুঁড়া দেড় চা-চামচ,

১১. লবণ পরিমাণমতো,
১২. কাঁচা মরিচ ফালি ৫-৬টা,
১৩. ধনিয়াপাতাকুচি ১ টেবিল চামচ।

প্রণালি :ছুরি মাছের শুঁটকি টুকরা করে গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। নরম হলে ভেতরের কাটা বেছে নিন। চিংড়ি মাছের মাথা ফেলে ধুয়ে রাখুন। অথবা কোরাল মাছ নিলে ছোট ছোট করে কেটে তেলে পেঁয়াজ অল্প ভেজে হলুদগুঁড়া, মরিচগুঁড়া, রসুনবাটা, পেঁয়াজবাটা, লবণ ও টমেটোকুচি দিয়ে কষান। এবার শুঁটকি দিয়ে নাড়ুন। চিংড়ি অথবা কোরাল মাছের টুকরা ঢেলে কষান। অল্প পানি দিয়ে ঢেকে দিন। ১০ মিনিট পর কাঁচা মরিচ ও ধনিয়াপাতাকুচি দিয়ে নামিয়ে নিন।.

৩।লইট্টা ভুনা

উপকরণ :
১. লইট্টা শুঁটকি ২০০ গ্রাম,
২. পেঁয়াজ কুচি ২৫০ গ্রাম,

৩. রসুন কুচি ১০০ গ্রাম,
৪. রসুন বাটা ১ চা চামচ,

৫. আদা বাটা আধা চা চামচ,
৬. হলুদ বাটা আধা চা চামচ,

৭. মরিচ বাটা আধা চা চামচ,
৮. কাঁচা মরিচ ফালি ৫টি,

৯. লবণ ১ চা চামচ,
১০. আস্ত জিরা আধা চা চামচ,

১১. পানি আধা কাপ,
১২. তেল আধা কাপ।

প্রণালি :আস্ত শুঁটকি আগুনে পুরপুর শব্দ হওয়া পর্যন্ত ছেঁকে নিন। এবার শুঁটকি ছোট ছোট টুকরা করে কেটে ধুয়ে পরিষ্কার করে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। চুলায় কড়াইয়ে তেল দিয়ে গরম হলে অর্ধেক পেঁয়াজ কুচি দিন। পেঁয়াজ বেরেস্তা হলে আস্ত জিরা দিন। জিরা ফুটে উঠলে শুঁটকি দিন। ভালো করে নেড়ে সব বাটা মসলা দিন। রেখে দেওয়া পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি ও লবণ দিয়ে কষিয়ে পানি দিয়ে ঢেকে আঁচ কমিয়ে দিন। ঢেকে দেওয়া শুঁটকি সিদ্ধ হয়ে মাখামাখা হলে কাঁচা মরিচ ফালি দিয়ে নেড়ে আবারও ঢেকে দিন। ভুনাভুনা হলে নামিয়ে ফেলুন।

৪।শুঁটকি পাতুরি

উপকরণ :
১. চ্যাপা শুঁটকি ৫০ গ্রাম,
২. আলু কুচি ২ কাপ,

৩. পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ,
৪. রসুন বাটা ২ টেবিল চামচ,

৫. মরিচ বাটা ৩ টেবিল চামচ,
৬. হলুদ বাটা ১ চা চামচ,

৭. আদা বাটা আধা টেবিল চামচ,
৮. ধনিয়াপাতা কুচি আধা কাপ,

৯. ফিশসস ১ টেবিল চামচ,
১০. তেল আধা কাপ,

১১. লবণ ১ চা চামচ,
১২. লাউ বা কুমড়াপাতা ১৫টি।

প্রণালি :শুঁটকি ধুয়ে বেটে নিতে হবে। কড়াইয়ে তেল দিয়ে পেঁয়াজ কুচি নরম করে ভেজে ধনিয়াপাতা ও লাউপাতা ছাড়া সব উপকরণ দিয়ে ভুনে নিন। এবার ধনেপাতা দিয়ে নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিন। ঠাণ্ডা করুন। পাতার মধ্যে পরিমাণমতো শুঁটকির পুর দিয়ে মুড়ে টুথপিক দিয়ে আটকে দিন। ফ্রাইপ্যানে অল্প তেল দিয়ে গরম হলে ভেজে নিন। ২ পিঠ ভালোভাবে ভাজুন।.

৫।চ্যাপা ভর্তা

উপকরণ :
১. চ্যাপাশুটকি ২০ গ্রাম,

২. শুকনা মরিচ ১৫টি,
৩. পেঁয়াজ টুকর ১ কাপ,

৪. রসুন কোয়া আধা কাপ,
৫. লবণ স্বাদমত,
৬. লাউপাতা ২টি।

প্রণালি :শুটকি পরিষ্কার করে ধুয়ে পাতা দিয়ে মুড়ে ফ্রাইপ্যানে সামান্য তেল দিয়ে ভেজে নিন সেদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত। ভাজার পর উপরের পাতাটি ফেলে দিন। রসুন কোয়া ভালভাবে টেলে নিন। পেঁয়াজও টেলে নিন যেন কচকচে ভাব থাকে। শিলপাটা শুকনা মরিচ বেটে নিন। এবার শুটকি, লবণ ও রসুন দিয়ে বাটুন। সবশেষে পেঁয়াজ দিয়ে আধাবাটা করে এক সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করুন।

৬।চিংড়ি শুঁটকি দিয়ে লতি

উপকরণ :
১. মাথা ছাড়ানো চিংড়ির শুঁটকি আধা কাপ,
২. কচুরলতি ৫০০ গ্রাম,

৩. রসুনবাটা দেড় চা-চামচ,
৪. পেঁয়াজকুচি ৯ টেবিল চামচ,

৫. তেল ১ টেবিল চামচ,
৬. লবণ স্বাদমতো,

৭. হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ,
৮. মরিচগুঁড়া ১ চা-চামচ,
৯. ধনিয়াপাতাকুচি ১ টেবিল চামচ।

প্রণালি :চিংড়ি শুঁটকির মাথা ফেলে ধুয়ে রাখুন। কচুরলতির আঁশ ফেলে টুকরা করে নিন। তেলে পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচগুঁড়া ও চিংড়ি শুঁটকি দিয়ে দিন। লতি সেদ্ধ হলে ধনিয়াপাতা, মরিচ দিয়ে নামিয়ে নিন।.

৭।নোনা ইলিশে বেগুন

উপকরণ :
১. নোনা ইলিশ ৪ টুকরা,

২. বেগুন ৫০০ গ্রাম,
৩. হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ,

৪. মরিচের গুঁড়া ১ চা-চামচ,
৫. তেল ১ চা-চামচ,

৬. জিরাগুঁড়া আধা চা-চামচ,
৭. কাঁচামরিচ ৪-৫টি,

৮. পেঁয়াজকুচি ১ টেবিল চামচ,
৯. রসুনবাটা ১ চা-চামচ।

প্রণালি :নোনা ইলিশ পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। বেগুন টুকরা করে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। তেলে পেঁয়াজ অল্প ভেজে হলুদগুঁড়া, মরিচগুঁড়া ও রসুনবাটা দিয়ে কষান। ইলিশ ও বেগুন ঢেলে দিয়ে নাড়তে থাকুন। অল্প পানি দিয়ে ঢেকে দিন। বেগুন সেদ্ধ হলে জিরাগুঁড়া ও কাঁচা মরিচ দিন। নোনা ইলিশে পর্যাপ্ত লবণ থাকায় তরকারিতে লবণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

৮।রূপচাঁদা শুটকির দোপেঁয়াজা

উপকরণ :
১. রূপচাঁদা শুটকি ১টি,
২. তেল পরিমাণ মতো,

৩. পেঁয়াজকুচি ২ কাপ,
৪. রসুনকুচি আধা কাপ,
৫. টমেটোকুচি আধা কাপ,

৬. সামান্য আদাবাটা,
৭. ধনিয়াগুঁড়া আধা চা-চামচ,

৮. মরিচগুঁড়া ৩ চা-চামচ,
৯. হলুদগুঁড়া দেড় চা-চামচ,

১০. কাঁচামরিচ ৬টি,
১১. লবণ স্বাদমতো।

প্রণালি :রূপচাঁদা শুটকি দুই ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। নরম হলে ছোট ছোট টুকরা করে কেটে, ভালো করে ধুয়ে নিন। এবার প্যানে তেল দিন। তেল গরম হলে তাতে পেঁয়াজকুচি, রসুনকুচি, সামান্য আদাবাটা, ধনিয়াগুঁড়া, মরিচ, হলুদ, তেল, লবণ, কাঁচামরিচ আর টমেটো-কুচি সব মসলা ভালো করে ভেজে নিন। পেঁয়াজ নরম হয়ে এলে তাতে মাছ দিয়ে কিছুক্ষণ ভাজুন। এবার অল্প পানি দিয়ে ভালো করে কষিয়ে ঢেকে দিন। পানি কমে মাখা মাখা হলে তাতে কাঁচামরিচ দিয়ে নামিয়ে ফেলুন।

৯।মসুরের ডাল ও কাঁচকি শুঁটকি চচ্চড়ি

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ মসুর ডাল ১ কাপ, কাঁচকি শুঁটকি ১০০ গ্রাম, মরিচ গুঁড়া ২ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়া ১ চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, রসুন কুচি এক কাপের চার ভাগের এক ভাগ, ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, তেল এক কাপের চার ভাগের এক ভাগ, ফিস সস ১ চা চামচ, কাঁচামরিচ ৬টি, পানি ২ কাপ, লবণ স্বাদমতো।

প্রস্তুত প্রণালীঃ শুঁটকি পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন। ডাল বাদামি বাদামি করে ধুয়ে ভেজে রাখুন। কড়াইয়ে তেল গরম হয়ে এলে পেঁয়াজ-রসুন কুচি ভেজে গুঁড়া ও বাটা মসলা দিন। সামান্য লবণ দিন। সামান্য পানি দিয়ে মসলা কষিয়ে নিন। মসলা ভালোমতো কষানো হলে কাঁচকি শুঁটকি দিন। শুঁটকি কষিয়ে এক কাপের চার ভাগের এক ভাগ পানি দিয়ে ঢেকে দিন। পানি শুকিয়ে গেলে ভাজা ডালগুলো দিয়ে দিন। নেড়েচেড়ে দেড় কাপ পানি দিয়ে ঢেকে চুলার আঁচ কমিয়ে দিন। মাখামাখা হলে চেড়া কাঁচামরিচ দিয়ে ঢেকে দিন। ডাল সিদ্ধ হয়ে পানি শুকিয়ে গেলে নামিয়ে নিন। পরিবেশন করুন গরম ভাতের সঙ্গে অথবা খিচুড়ির সাথে। খেতে পারেন বর্ষণক্লান্ত কোন একদিনে।

১০। কাঠালের বিচি শুঁটকি

প্রয়োজনীয় উপকরণ: কাঁঠালের বিচি আধা কাপ, শুঁটকি মাছ ১/২ কাপ, রসুন কাটা আধা কাপ, পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, রসুন বাটা এক চা চামচ, মরিচের গুঁড়া ১ চা চামচ, হলুদ সামান্য, কাঁচামরিচ ফালি ৪-৫টি, তেল আধা কাপ, লবণ স্বাদ অনুসারে, জিরার গুঁড়া ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া আধা চা চামচ।

প্রণালী: শুঁটকি মাছ কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। কাঁঠালের বিচি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এবার কড়াইয়ে তেল দিয়ে রসুন কুচি দিয়ে একটু নেড়েচেড়ে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে একে একে সব মসলা দিয়ে কষিয়ে শুঁটকি ও বিচি দিয়ে কষাতে হবে। খুব ভালো করে দুবার কষিয়ে তেলের ওপর উঠলে নামিয়ে নিন। গরম ভাতে এবং লাউএর শাকের সাথে পরিবেশন করতে পারেন।

Share this post